মো: শহীদুল ইসলাম, উপপরিচালক,
পরিবার পরিকল্পনা, নারায়ণগঞ্জ
বাংলাদেশে পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচি বাস্তবায়নে নারায়ণগঞ্জ এর পরিবার পরিকল্পনা বিভাগ প্রযুক্তি ব্যবহার করে কার্যক্রম বাস্তবায়নের একটি মডেলে রূপান্তরিত হয়েছে। পরিবার পরিকল্পনা বিভাগীয় কার্যক্রমকে সংজ্ঞায়ন করা হয়েছে। পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের কার্যক্রম বাস্তবায়নে পরিবার কল্যাণ সহকারী রেজিস্টার-কে ফোকাস করা হয়েছে। বিভাগীয় কার্যক্রমের একটি মেরুদন্ড ঠিক করা হয়েছে। বিভিন্ন পর্যায়ে মানুষের ধারণা ছিল যে পরিবার পরিকল্পনা বিভাগ শুধু জন্ম নিয়ন্ত্রণের কয়েকটি পদ্ধতি নিয়ে কাজ করছে। এমনকি বিভাগীয় কর্মচারীদেরও অনুরূপ ধারণা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু যুগের বিবর্তনে পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচিকে মাতৃস্বাস্থ্য সেবা, প্রজনন স্বাস্থ্য সেবা এবং পুষ্টির সাথে সমন্বিত করে বাস্তবায়নে অধিকতর মনোযোগ প্রদান করা হয়েছে। কার্যক্রমের মেরুদন্ডটি হলো- Family Planning (FP)-Mother Child Health(MCH)-Adolescent Reproductive Health(ARH)-Nutrition(N)- যা সংক্ষেপে FP-MCH-ARH-N হিসেবে উপস্থাপন করে কার্যক্রমকে বহুমুখি করার প্রচেষ্টা গ্রহণ করা হয়েছে। বাংলাদেশের জনসংখ্যা নীতির সাথে যা সামঞ্জস্যপূর্ণ।
আধুনিক প্রযুক্তি (বিশেষ করে AI) ব্যবহার করে সেবা প্রদানকারীদের জ্ঞান সমৃদ্ধ করার মাধ্যমে মানুষের দোরগোড়ায় সেবা পৌঁছে দেয়ার কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হয়েছে। AI এর উপরে জেলাধীন সকল কর্মকর্তা-কর্মচারীদের স্থানীয় ব্যবস্থাপনায় প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে। প্রশিক্ষণের শিরোনাম ছিল- AI for Field Workers: পরিবার পরিকল্পনা, মাতৃস্বাস্থ্য ও পুষ্টি সেবায় আধুনিক BCC কৌশল”। প্রশিক্ষণ শেষে সকল কর্মকর্তা কর্মচারী প্রযুক্তি ব্যবহার করে সক্ষমতা প্রদর্শন করছেন। প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিচর্যায় AI ব্যপক অবদান রাখতে পারে। AI প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত কর্মকর্তা- কর্মচারীগণ জানান যে, মাঠ পর্যায়ে সেবা প্রদানে AI প্রযুক্তি ব্যবহার তাদেরকে কর্মসূচি বাস্তবায়নে আরো বেশি কনফিডেন্স তৈরি করছে। এ বিষয়ে জেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের পক্ষ থেকে google form ব্যবহার করে একটি গবেষণা পরিচালনা করা হয়েছে।
উক্ত গবেষণায় সফলভাবে প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া গিয়েছে। পরিবার পরিকল্পনা একটি সামাজিক আন্দোলন। সে থিমকে কাজে লাগিয়ে সকল কর্মকর্তা কর্মচারী বিভাগীয় কার্যক্রমকে দৃশ্যমান করা করছেন। সামাজিক যোগাযোগ- ফেসবুক একাউন্ট, ফেসবুক গ্রুপ এবং ফেসবুক পেইজ এর মাধ্যমে বিভাগীয় কার্যক্রমকে মানুষেরি নিকট তুলে ধরছেন। এছাড়া জেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ে ফেসবুক গ্রুপে সকল কর্মকর্তা কর্মচারী দৈনন্দিন কার্যক্রম দৃশ্যমান করার প্রতিযোগিতা করছে। এরফলে ভাল কার্যক্রম অতি সহজেই রেপ্লিকেট হচ্ছে। এ ছাড়া বিভাগীয় সুনাম তৈরিতে অবদান রাখছে। জেলায় ৫০টির বেশি ফেসবুক পেইজ রয়েছে। বেশ কয়েকজন সেবা প্রদানকারী রয়েছেন যারা সচেতনভাবে নিজেরাই মেসেজ ডেভেলপমেন্ট করে তা জনস্বাস্থ্য উন্নয়নে প্রচার করছেন। বন্দর উপজেলায় কয়েকজন কর্মচারী নিজেদের উদ্যোগে VIA-CBE সচেতেনতায় ভিডিও তৈরি করে প্রচার করছেন। যা স্তন ও জরায়ুর মুখে ক্যান্সার স্ক্রিনিং কার্যক্রমে সচেতেনতা তৈরিতে সহায়তা করছে।
সন্বিতভাবে আইসিটি ব্যবহার করে বিভাগীয় কার্যক্রম সম্পাদনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। জেলা/উপজেলার ওয়েবপোর্টাল হালনাগাদ করা হয়েছে। জেলার ইউটিউব চ্যানেল থেকে প্রশিক্ষণ সংক্রান্ত ভিডিও শেয়ার করা হয়। সবচেয়ে বড় সফলতা রয়েছে জেলা ও সকল উপজেলায় সমন্বিতভাবে ডিনথি বাস্তবায়নে। জেলা/উপজেলায় ডিনথি বাস্তবায়ন করে পেপারলেস ইনিসিয়েটিভ গ্রহণ করা হয়েছ্।
সরকারের নির্বাচনী অংগীকার বাস্তবায়নে ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা প্রনয়ন করা হয়েছে। এছাড়া প্রাথমিক স্বাস্থ্য সেবা প্রদানের উপযোগী করে মাঠ কর্মীদের প্র্র্র্র্শিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে। প্রিভেন্টিভ স্বাস্থ্যকে ফোকাস করে কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। পরিবার পরিকল্পনা পরিদর্শক দের স্কুল স্বাস্থ্য শিক্ষা প্রদানের উপযোগী স্থানীয় পর্যায়ে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে। জেলাব্যাপী মঙ্গলবার স্কুল স্বাস্থ্য শিক্ষা কর্মসূচি সফলভাবে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। পরিবার পরিকল্পনা পরিদর্শকগণ এ বিষয়ে নিজেদের সক্ষমতা প্রদর্শন করেছেন। এছাড়া ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় সেবার প্যাটার্ন পরিবর্তনের প্রচেষ্টা গ্রহণ করা হয়েছে। মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র এবং শহুরে এলাকায় অবস্থিত স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে কাউন্সিলিং বুথ তৈরি করা হয়েছে যা বেশ জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। পরিবার পরিকল্পনা পরিদর্শক এবং পরিবার কল্যাণ
সহকারীদের সমন্বিত প্রচেষ্টায় সফলভাবে কাউন্সিলিং বাস্তবায়ন করা হয়েছে। গার্মেন্টস শিল্পে সেবা সম্প্রসারণে স্যাটেলাইট ক্লিনিক সংগঠন বৃদ্ধি করা হয়েছে। শহুরে এলাকায় পরিবার কল্যাণ পরিদর্শক/ পরিবার কল্যাণ সহকারীদের অগ্রীম ভ্রমনসূচিতে গার্মেন্টস শিল্পে সেবা সম্প্রসারণে কার্যক্রমের প্রতিফলন রয়েছে।
উপজেলা সমূহের প্রেক্ষাপট বিবেচনা করে ইউনিক অগ্রীম ভ্রমনসূচি তৈরি করা হচ্ছে। এরফলে অগ্রীম ভ্রমনসূচি তৈরিতে বিভাগীয় সম্প্রসারিত কার্যক্রম ( FP-MCH-ARH-N) ফোকাস হচ্ছে।
গর্ভবতী নারীদের সেবা বৃদ্ধি করার জন্য Google Form এ গর্ভবতীর ডিজিটাল তালিকা তৈরি করে ব্যবহার করা হচ্ছে। এতে গর্ভবতী নারীদের ট্রাকিং করে ANC কার্ড প্রদানপূর্বক সেবা প্রদান করা সহজ হচ্ছে। অনুরূপভাবে শিশুদের একটি ডিজিটাল তালিকা করা হয়েছে। উভয় তালিকা ব্যবহার করে মা ও শিশু সেবা নিশ্চিত করার পাশাপাশি জন্ম নিবন্ধন কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। উক্ত তালিকায় প্রায় ১৫ হাজার গর্ভবতী এবং ১০ হাজার শিশু রয়েছে। তালিকা আপডেট করার কার্যক্রম চলমান রয়েছে। এটা কর্মচারীদের ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহারের সক্ষমতার একটি পরিচয়।
জালকুড়িস্থ জেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের ক্যাম্পাসে ২৫০ শতাংশ জমি রয়েছে। ইতোমধ্যে জেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের নামে ১৩৪ শতাংশ জমি মিউটেশন করা হয়েছে। মানুষের চাহিদা বিবেচনা করে জালকুড়ি বিশেষ টাইপের মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রে ২৪/৭ স্বাভাবিক প্রসব সেবা শুরু করা হয়েছে এবং সেবা সফলভাবে চলমান আছে। কোয়ালিটি সেবা বৃদ্ধি করার জন্য তিনটি মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রের জন্য স্থানীয় পর্যায়ে পরিচোলনা কমিটি তৈরি করা হয়েছে। ইতোমধ্যে কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। ব্যবস্থাপনায় নতুনত্ব, ইনোভেটিভ আইডিয়া এবং প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে প্রায় সকল কেন্দ্রে স্বাভাবিক প্রসব সেবা শুরু করা সম্ভব হয়েছে। সেবা কেন্দ্রের সেবা প্রদানের চ্যালেঞ্জসমূহ মোকাবেলা অব্যাহত থাকলে স্বাভাবিক প্রসব সেবা ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাবে।
মাল্টিসেক্টরাল সমন্বয়ের মাধ্যমে জেলা পরিষদ থেকে ১ লাখ আয়রন ও ফলিক এসিড, জেলাধীন সকল সেবা প্রদানকারীদের জন্য বিপি- স্টেথো এবংগ্লুকোমিটার সংগ্রহ করা হয়েছ্। এছাড়া মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রের জন্য ডায়াথার্মি মেশিন সংগ্রহ করা হয়েছে। ১৫ টি সেবা কেন্দ্রের সেবার মানোন্নয়নে একটি প্রকল্প জেলা পরিষদে বাস্তবায়নাধীন রয়েছে। মাল্টিসেক্টরাল সম্বয়ের মাধ্যমে সেবা কেন্দ্র ও মাঠ পর্যায়ে কোয়ালিটি সেবা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এছাড়া কয়েকটি উপজেলায় উপজেলা পরিষদ থেকে অনুরূপ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। যা প্রাথমিক স্বাস্থ্য তথা প্রিভেন্টিভ স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা উন্নয়নে ব্যাপক ভূমিকা পালন করছে। প্রিভেন্টিভ স্বাস্থ্য সেবা বাস্তবায়নে নিজের ক্যাম্পাস নিজেরাই পরিষ্কার পরিছন্ন করা হচ্ছে। সকল কর্মকর্তা কর্মচারী নিজেদের সেবা কেন্দ্রের ক্যাম্পাস পরিষ্কারে নিজেরাই অংশগ্রহণ করেন। এছাড়া নিজ নিজ ক্যাম্পাসে নিয়মিত গাছের চারা রোপন করা হচ্ছে। জেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালযের ক্যাম্পাসে ইতোমধ্যে বাগান সৃজন করা হয়েছে।
বিশেষভাবে বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস-২০২৬ উদযাপন উপলক্ষে একটি ই-স্যুভেনির তৈরি, নারায়ণগঞ্জের নিজস্ব থিমসং তৈরি এবং নারায়ণগঞ্জের পরিবার পরিকল্পনা বিভাগীয় কার্যক্রমের উপর একটি ডকুমেন্টারি তৈরি করা হয়েছে। সার্বিকভাবে জেলাধীন পরিবার পরিকল্পনা বিভাগীয় কার্যক্রমে নতুনত্ব তৈরি হয়েছে। প্রযুক্তি, জ্ঞান ও দক্ষতা ব্যবহারের সমন্বয়ে কার্যক্রমের কোয়ালিটি বৃদ্ধি পেয়েছে। সামাজিক যোগাযোগে দৈনন্দিন কার্যক্রম সম্মিলিতভাবে প্রদর্শনের ফলে বিভাগীয় সুনাম বৃদ্ধি পেয়েছে। সময়পোযোগী ইনোভেটিভ কার্যক্রম গ্রহণের ফলে প্রিভেন্টিভ ও প্রমোটিভ স্বাস্থ্য সেবার উন্নয়ন হচ্ছে। তাই, নারায়ণগঞ্জ পরিবার পরিকল্পনা বিভাগীয় সেবা বাংলাদেশের অনন্য একটি অবস্থানে রুপান্তর হয়েছে।






